শিরোনাম :
সেনবাগে কাবিলপুর একতা সমাজ সংঘের উদ্দ্যোগে ইফতার পার্টি ও ঈদ বস্র উপহার বিতরণ সেনবাগে সৈয়দ হারুন ফাউন্ডেশনের পক্ষ হতে ৪০০ পরিবারকে ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ সেনবাগে সেলিম উদ্দিন কাজল এর উদ্দ্যোগে দেশবাসীর জন্য দোয়াও মেজবানী অনুষ্ঠিত সেনবাগে কাবিলমিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্দ্যোগে ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ সেনবাগে অসহায় গরীবের মাঝে প্যানেল চেয়ারম্যান স্বপনের ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ ফরিদপুর জেলা পুলিশের প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত মীনার স্বপ্নপূরণের সহযাত্রী ফরিদপুর জেলা প্রশাসন বৃহত্তর গোয়ালচামট বাসীর পক্ষ থেকে শান্তিনিবাসে ইফতার বিতরণ সেনবাগে পৌরমেয়র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বাবুর করোনাকালীন খাদ্য সামগ্রী বিতরণ সচেতনতা মুলক স্টিকার ও মাস্ক বিতরণ করলো জনপ্রিয় সেচ্ছাসেবী সংঘঠন ত্রিশাল হেল্পলাইন
নোটিশ :
Wellcome to our website...

নজরুল ইসলাম ফয়সালের পরিবার দূর্ঘটনায় এখনো শোক কাটে নি

প্রথমসংবাদ ডেক্স : / ৫০ বার
আপডেটের সময় : রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

‘মানুষ মরণশীল’ -একথা চিরন্তন সত্য। কিন্তু মাঝে মাঝে সত্যটা মেনে নেয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তার চেয়েও বেশি কঠিন পরিবারের আপন মানুষদের হারিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা। কিন্তু একজন মানুষ যখন তার পরিবারের সকল সদস্যকে একসাথে হারায়, তখন তার পক্ষে পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা অনর্থক এবং অসম্ভব বলে মনে হয়। তবুও মাতা-পিতা, ভাই-বোন ও মামা সহ সকলকে একসঙ্গে হারিয়ে ১৭টি বছর পার করছেন নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের নজরুল ইসলাম ফয়সাল। আজ সেই ভয়াবহ ২৭ ফেব্রুয়ারি। ২০০৪ সালের এই দিনে এক মারাত্মক ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি তার পরিবারের ৬ সদস্যকে একসঙ্গে হারিয়ে পৃথিবীতে একা হয়ে পড়েন। সেই থেকে শুরু হয় তার জীবনের একাকী পথচলা। জীবন সংগ্রামে ১৫/১৬ বছরের একটি বালক দিশেহারা হয়ে পড়ে। তার অসহায় জীবনে অবিভাবক বলতে তেমন কেউই ছিলেন না। তবুও তিনি থেমে থাকেন নি। মৃত বাবার রেখে যাওয়া ডেসটিনি ২০০০ লিঃ এর বিজনেস সেন্টারটি তাকে দেয়া হয় ডেসটিনির পক্ষ থেকে। সে সময় তার পিতৃতুল্য ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমিন এবং একই কোম্পানির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ হোসাইন এগিয়ে আসেন নজরুল ইসলাম ফয়সালের পাশে। ভালোই কাটছিলো তার জীবন। ধীরে ধীরে জীবনের আলো ফিরে পাচ্ছিলেন। তিনি পিতার অভাব ভুলতে শুরু করেছিলেন এবং নিয়মিত আয় রোজগারও করছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ২০১২ সালে ডেসটিনির উপর বিভিন্ন অভিযোগ চাপিয়ে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে আবার ঝড় আসে ফয়সালের জীবনে।

নজরুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, ‘এখন আর কেউ খবর রাখেনা আমার’! মাতাপিতা, ভাইবোন হারানোর পর অবিভাবক হিসেবে যাদের পেয়েছিলাম, তারাও এখন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমার খবর কে নেবে? তাই ফয়সাল তার মনের সকল আকুতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চান।

তিনি বলেন, আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীও ১৫ই আগস্ট অল্প বয়সে আপনজন হারিয়েছেন। তাই আপনজন হারানো মানুষের বেদনা তিনিই বুঝবেন। আমি আমাদের মাদার অব হিউম্যানিটি, বিশ্ব নন্দিত প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি আমার সুন্দর জীবন ফিরে পেতে আপনার হস্তক্ষেপ চাই। একবার শুধু আপনার কাছে আমার মনের কথাগুলো খুলে বলতে চাই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, এদেশে একমাত্র আপনিই আমার দুঃখ বুঝবেন।” তাই আমি আমার নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি কথাগুলো বলতে চাই। সাংবাদিক ভাইবোনদের অনুরোধ করছি, আমার কথাগুলো মিডিয়ায় তুলে ধরে আমার পাশে থাকুন প্লিজ।এভাবেই নিজের মনের আকুতি প্রকাশ করেন নজরুল ইসলাম ফয়সাল।

আর কোন মানুষ যেন এভাবে একসঙ্গে পরিবার পরিজন হারিয়ে অসহায় জীবন কাটাতে না হয়, আজকের এই দিনে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

উল্লেখ্য নজরুল ইসলাম ফয়সালের বাবা জনাব রুহুল আমিন ভুঁইয়া তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। অত্যন্ত ধার্মিক এই ব্যক্তি দেশ বিভাগের সময় প্রিয় পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং করাচিতে সুন্দর একটু জীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে নিজ জন্মভূমিকেই বসবাসের স্থান হিসেবে বেছে নেন। বিয়ে করেন পার্শ্ববর্তী গ্রামের আলেয়া বেগম পরানিকে। নোয়াখালির সেই দুই গ্রামের মাঝেই গড়ে তোলেন তিন ছেলে এবং একটিমাত্র কন্যা নিয়ে সুখের সোনালী সংসার। পরবর্তি জীবনে তিনি ভাগ্যান্বেশনে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকা শহরে। কঠোর পরিশ্রম করে নিজের এবং পরিবারের জন্য গড়ে তোলেন সুখ এবং স্বাচ্ছ্বন্দের সংসার। রাজধানীর মেমোরি হোটেলে চাকরী করেন, পাশাপাশি ডেসটিনি ২০০০ নামক একটি কোম্পানির সাথেও কাজ করতে থাকেন। আর্থিকভাবে বেশ সফলতা লাভ করেন।

এরমধ্যে বেড়ে ওঠেন ফয়সাল এবং তাঁর ভাই বোনেরা। বাবা রুহুল আমিন ভুঁইয়া তাদের নিয়ে আসেন ঢাকা শহরে। সেইসাথে নিয়ে আসেন তাঁর শ্যালক শাহজাহানকেও যুক্ত করে নেন তাঁর পরিবারের সাথে।

সময় বয়ে যায়। তিন পুত্র নজরুল ইসলাম ফয়সাল, ফাহিমুল ইসলাম নাদিম, ফখরুল ইসলাম এবং কন্যা রাবেয়া বসরী তামান্নাকে নিয়ে সুখেই কাটছিল দিনগুলো। এরমধ্যে শ্যালক শাহজাহানের বিয়ে ঠিক হয় গ্রামের বাড়িতে। সপরিবারে সকলেই আসেন বিয়ের প্রস্তুতি এবং অনুষ্ঠানে যুক্ত হতে। আনন্দ উল্লাসে কেটে যায় সময়টা। তাঁদের যাতায়াতের মাধ্যম ছিল নিজেদের একটি গাড়ী। বিয়ের সকল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাতদিন পরে ফয়সাল একলা ফিরে যান ঢাকায় পড়াশুনা এবং কাজের সুবাদে। পরের দিন ২৭ শে ফেব্রুয়ারী ২০০৪ সালে জনাব রুহুল আমিন ভুঁইয়া, তাঁর স্ত্রী, ছোট দুই ছেলে, এক মেয়ে, তাঁর সদ্য বিবাহিত শ্যালক এবং গৃহ পরিচারিকা মনি রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। নিজেদের প্রাইভেট গাড়ীতে। রওনা দেওয়ার পূর্বমুহূর্তে ফয়সালের কথা হয় তাঁর ছোট ভাই এর সাথে। পেছন থেকে শুনতে পান তার আদরের ছোট বোন তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। কিন্তু বলা হয় নি।

ফয়সাল ঘুমিয়ে ছিলেন তাঁর বাবার কর্মক্ষেত্র মেমরি হোটেলের একটি রুমে যখন শুনতে পান হোটেলের কর্মচারিরা কানাঘুষা করছেন। একজন এসে তাকে বলেন একটি সামান্য একসিডেন্ট হয়েছে এবং তাঁকে দ্রুত নোয়াখালি যেতে হবে। রাজু নামক তাঁর এক কলিগ তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। বাসে যাবার সময় তিনি ছোটবোনটির জন্য দুটি ক্যান্ডি কেনেন। একসময় বাসটি কুমিল্লা নিমসার বাজারের পথ অতিক্রম করে। সেখানে তিনি একটি একসিডেন্ট দেখতে পান এবং আরও দেখেন রাস্তার পাশে কিছু লাশ পড়ে রয়েছে। তাঁর খারাপ লাগে, কিন্তু তখনও তিনি জানেন না আল আরাফাহ নামক যাত্রীবাহী বাস একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে ধাক্কা দেয় তার পারিবারিক প্রাইভেট গাড়ীটিকে। অনেকটা পথ টেনে নিয়ে যায় বাসের মাঝে আটকে পড়া তার পরিবারের সমস্ত সদস্যসহ গাড়ীটিকে। টেনে নিয়ে যাওয়ার ফলে উঁচু নিচু ধাক্কায় মাথার সাথে বাড়ি লেগে খুলি ফেটে বের হয়ে আসে মগজ। আর ঘাতক বাসের ড্রাইভার বাস চলন্ত রেখেই পালিয়ে যায় ঘটনাস্থল ছেড়ে। তিনি তখনও জানেন না, রাস্তার পাশে বিছিয়ে রাখা লাশগুলো তাঁরই তিনি তাঁর নানাবাড়ী এসে পৌঁছান। আত্মীয়দের মাঝে অনেকেই তাকে দেখে চমকে ওঠেন কারন তারা জানতেন তিনি সহ সকলে মারা গেছেন। স্বস্তির নি:শ্বাসও ফেলেন অনেকেই। নজরুল ইসলাম ফয়সাল ধীরে ধীরে সব জানতে পারেন। কিভাবে কুমিল্লার নিমসার বাজারের আবু তাহের চেয়ারম্যানের বাসার সামনে দুর্ঘটনা ঘটে। কিভাবে স্থানীয় লোকেরা লাগেজের ভিতর থেকে তার মামার বিয়ের কার্ড পেয়ে সেখানে উল্লেখিত এক আত্মীয় ফরহাদ সাহেবের নম্বর পেয়ে তাকে খবর জানান এবং সেখান থেকে ফরহাদ সাহেব সব কিছুর দায়িত্ব নেন। পরের দিন জীবন্মৃত অবস্থায় ফয়সাল নিজ হাতে কবরে শোয়ান তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে। এরপর অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নজরুল ইসলাম ফয়সালের দায়িত্ব নেন তার বন্ধু আব্দুল কাদের জিলানী। তাঁর সঙ্গ ফয়সালকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলে। তবে হৃদয়ের বিশাল একটা অংশ তিনি স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলেন। কুমিল্লার আবু তাহের চেয়ারম্যান যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন দুর্ঘটনার সময়ের সকল জিনিসপত্র। তিনি নিজ সন্তানের মত স্নেহ করে বুঝিয়ে দেন প্রতিটি জিনিস। নজরুল ইসলাম ফয়সাল হয়ে ওঠেন অন্য এক মানুষ।

পরবর্তী জীবনে তিনি কিন্তু ভেঙে পড়েন নি। তিনি ঠিকই পূর্ণ করেছেন তাঁর বাবার রেখে যাওয়া বহু অসমাপ্ত কাজ। নিজে পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছেন একটি স্বচ্ছ্বল জীবন। এর মাঝেও অনেক চড়াই উৎরাই গেছে। জীবনের কঠিন কষাঘাতে তিনি যেমন চিনেছেন মানুষের নিষ্ঠুরতা, তেমনই ভাবে তিনি জেনেছেন মানুষের উদারতা। মেমরী হোটেলের মালিক, তার নিজের নানা নানীর কাছ থেকে তাঁর হৃদয় যেমন ভেঙেছে, তেমনই ডেসটিনি ২০০০, তার দাদা বাড়ীর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এবং প্রতিবেশীরা তাঁকে দিয়েছেন বেঁচে থাকার, যুদ্ধ করে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
নজরুল ইসলাম ফয়সাল এখন একজন স্বাবলম্বী যুবক। তিন সন্তানের গর্বিত পিতা এবং তাঁর এলাকার একজন সন্মানিত ব্যাক্তি।তিনি আজও যুদ্ধ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক আন্দোলন “নিরাপদ সড়ক চাই” এর সাথে। বর্তমানে তিনি একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। এছাড়াও বাবার স্মৃতি হৃদয়ে গেঁথে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “আর.আমিন ফাউন্ডেশন” যেখান থেকে তিনি তাঁর নিজস্ব নোয়াখালি এলাকায় দুস্থ জনগনের সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন।


এ জাতীয় আরো সংবাদ